আজ ২৫ জুলাই, শনিবার। ২০২৪ সালের এই দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। এদিন স্বৈরাচার হাসিনা অভিনয় করার জন্য মেট্রো স্টেশন দেখতে যান। তিনি মেট্রোস্টেশন দেখে কান্নায় ভেঙে পরেন। পত্র-পত্রিকার ছবিতে তার চোখ ভেজা দেখা যায়। তিনি বার বার রুমাল দিয়ে চোখের পানি মুছেন। তিনি দেশবাসীর কাছে বিচার দেন। এদিনও পুলিশের গুলীতে আহতদের মধ্যে কয়েকজনের মৃত্যুর খবর আসে। আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর ধরপাকড় অব্যাহত থাকে। একইদিন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি প্রতিবেদন দিয়ে বলে যে, আন্দোলন দমন করতে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করেছে পুলিশ। জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা আন্দোলন দমনের নামে ক্র্যাক ডাউন বন্ধ করার আহ্বান জানায়। ২৫ জুলাই জাপা নেতা আন্দালিব রহমান পার্থ, ব্যবসায়ী ডেভিড হাসনাতসহ আরও ডজন খানেক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ রাখা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও তিনজন মারা যান, মৃত্যুর সংখ্যা ২০৪ জনে দাঁড়ায়।

২৫ জুলাই সকালে ক্ষতিগ্রস্ত মিরপুর-১০ মেট্রো স্টেশন পরিদর্শনে যান প্রধানমন্ত্রী। নিজেই পুরো স্টেশন এলাকা ঘুরে দেখেন। একপর্যায়ে স্টেশনের ধ্বংসলীলা দেখে কেঁদে ফেলেন প্রধানমন্ত্রী। বারবার নিজের অশ্রু সংবরণের চেষ্টা করতে দেখা যায়। এ সময় ধ্বংসযজ্ঞকারীদের রুখে দিতে জনসাধারণকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

দেশীয় মিডিয়াগুলো শেখ হাসিনার মেট্রোরেল স্টেশন পরিদর্শনের খবর ফলাও করে প্রচার করে। তাতে বলা হয়, কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে মেট্রোরেলের স্টেশনসহ সারা দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যারা ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে জনগণকে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৃহস্পতিবার জুলাই ২৫ সকালে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় ক্ষতিগ্রস্ত মিরপুর-১০ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশন পরিদর্শন শেষে তিনি এ কথা বলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘প্রথমে এক দফা কোটা সংস্কার করতে হবে। কোটা বাতিলও করে দিয়েছিলাম। আচ্ছা কোটা সংস্কার হবে। আপিল করলাম। উচ্চ আদালত সিদ্ধান্ত দেবে। সে পর্যন্ত ধৈর্য্য ধরতে হবে। যেকোন নাগরিককে তো আইন আদালত মেনেই চলতে হবে। সেটা না, ওই এক দফার পরে আসলো ৪ দফা, তারপর আসলো ৬ দফা, তারপর আসলো ৮ দফা, তারপর আবার ৪ দফা। আবার ৪ দফাও হবে না। আরও ৮ দফা। এই ভাবে এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি। আর সেই সাথে সাথে এই ধ্বংসযজ্ঞ। মানে ধ্বংসযজ্ঞের সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া।

২৫ জুলাই বৃহস্পতিবার দুপুরে একটি বিবৃতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের মজুমদার ও রিফাত রশীদ। ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক মো. নাহিদ ইসলামের বক্তব্য’ শিরোনামে বিবৃতিটি পোস্ট করা হয়।

বিবৃতিতে দেওয়া বার্তায় ছিলো রংপুরের আবু সাঈদসহ নিহতদের স্মরণ করুন; তাঁদের কবর জিয়ারত করুন; পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান; হাসপাতালে থাকা আহতদের যথাসম্ভব সহযোগিতার চেষ্টা করুন; সক্ষমতা থাকলে নিহতদের পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করতে সহায়তা করুন; মর্যাদার সঙ্গে দাফন ও জানাজায় অংশ নিন; হতাহতদের তালিকা তৈরি ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন; হত্যা ও হামলায় সরাসরি জড়িত সন্ত্রাসী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের চিহ্নিত করে রাখুন; যারা যে স্থানে আন্দোলন করেছেন, নতুন করে সংগঠিত হন; নিরাপদে থাকুন, চিকিৎসা নিন ও গ্রেপ্তার এড়ান; ফেসবুকে ক্ষোভ না ঝেড়ে মাঠের প্রস্তুতি নিন; ইন্টারনেটনির্ভর না হয়ে বিকল্প কিছু পরিকল্পনা করুন; আমরা কেন্দ্রীয়ভাবে দ্রুত সবার সঙ্গে যোগাযোগ করব; শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ ক্যাম্পাস ও হল খোলার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে চাপ দিন; শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন এবং প্রবাসীরা আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ক্র্যাকডাউন ও হত্যা-নিপীড়নের ঘটনা প্রচার করুন এবং দেশে আন্দোলনরত ছাত্র-নাগরিকদের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়ান। ‘ছাত্র-নাগরিক হত্যা ও গুম-খুনের বিচার, রাষ্ট্রীয় ক্ষয়ক্ষতির বিচার, মামলা প্রত্যাহার ও ডাকসুর সাবেক সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেনসহ নিরপরাধ ব্যক্তিদের মুক্তি, আহত-নিহতদের ক্ষতিপূরণ এবং সব ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসী রাজনীতির উৎখাত ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিচারের দাবিতে’ দফাভিত্তিক আন্দোলন অব্যাহত রাখার কথা জানানো হয়েছে বিবৃতিতে।

আপিল বিভাগের রায়ের পর কোটা সংস্কার করে সরকারের দেওয়া প্রজ্ঞাপনের বিষয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও অন্য অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই কোটা সংস্কারের যে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে, সেটিকে তাঁরা চূড়ান্ত সমাধান মনে করছেন না। তাঁরা মনে করেন, যথাযথ সংলাপের পরিবেশ তৈরি করে নীতিনির্ধারণী জায়গায় সব পক্ষের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে প্রজ্ঞাপন দিতে হবে। অংশীদারদের অংশগ্রহণে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করতে হবে, যা কোটাপদ্ধতির সুষ্ঠু বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণ ও তদারক করবে। কোটার যেকোনো পরিবর্তন এই কমিশনের সুপারিশ সাপেক্ষে হতে হবে। এ ছাড়া সংসদে আইন পাসের বিষয়টি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। তাই কোটা সমস্যার এখনো চূড়ান্ত সমাধান হয়নি। ২০১৮ সালেও আন্দোলনের চাপে পরিপত্র জারি করা হয়েছিল। ছয় বছর পরই সেটি বাতিল হয়। তাই এই পরিপত্র বা প্রজ্ঞাপনের ‘খেলায়’ তাঁরা আর বিশ্বাস করেন না। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন আর কেবল কোটা সংস্কারের বিষয়ে সীমাবদ্ধ নেই। তাই প্রজ্ঞাপন জারির সঙ্গেই এ আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটবে না।

এদিন কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর আইন বহির্ভূতভাবে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার করেছে অভিযোগ করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিবৃতি দেয়। তাতে বলা হয়, বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর আইনবহির্ভূতভাবে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার করেছে। লন্ডনভিত্তিক এই মানবাধিকার সংস্থা বলেছে, বাংলাদেশে সহিংসতার তিনটি ভিডিও বিশ্লেষণ করে তারা এই প্রমাণ পেয়েছে। বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে অ্যামনেস্টি বলেছে, আন্দোলনÑসহিংসতার প্রেক্ষাপটে কারফিউ জারি এবং ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়ায় বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি মনিটরিং করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। এর মধ্যে যেসব ভিডিও এবং আলোকচিত্র পাওয়া যায় সেগুলো যাচাইÑবাছাই ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল উদ্ভূত পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে। অ্যামনেস্টি ও এর ক্রাইসিস এভিডেন্স ল্যাব বিক্ষোভ দমনের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আইনবহির্ভূতভাবে প্রাণঘাতী ও কম প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের তিনটি ঘটনার ভিডিও যাচাই করেছে।

২৪ জুলাই বুধবার রাত ১টার দিকে ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থকে তার রাজধানীর গুলশানের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার তাকে আদালতে হাজির করা হয়। ব্যারিস্টার পার্থের বিরুদ্ধে 'কোটা সংস্কার আন্দোলনে উসকানি দেওয়ার অভিযোগ পাওয়ায়' তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানান ডিবি প্রধান। এই গ্রেপ্তারের ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, 'আন্দোলনে ভূমিকা রাখার মিথ্যা অভিযোগে ঢালাওভাবে বিএনপি ও বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় সদস্য দোষারোপ করছে। যদি তাই হয়, তাহলে তাদের ঘটনাস্থল থেকে গ্রেফতার করা হয়নি কেন? এটাই জনগণের প্রশ্ন।' মির্জা ফখরুল বলেন, 'এতে প্রমাণিত হয় যে, বিএনপি কিংবা বিরোধী দলের কেউই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত নয়। কয়েকদিন ধরে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর নেতাকর্মীদের অব্যাহত গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন তিনি।

রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস আড়াল করতে এবং উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানোর অপকৌশল হিসেবে বিএনপির নির্দোষ নেতাকর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে অভিযান চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন বিএনপি মহাসচিব।

তিনি পুরো ঘটনা ও হত্যাকাণ্ডের আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জানিয়ে বলেন, জনগণ পুরো ঘটনা ও হত্যাকাণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি করে। এছাড়া ব্যর্থতার সব দায় নিয়ে অবিলম্বে সরকারের পদত্যাগ করা উচিত বলে জনগণ মনে করে।