বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ইন্তিকাল করেছেন। গতকাল রোববার ভোরে রাজধানীর একটি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয় (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। ভোর ৪টার দিকে রাজধানীর শ্যামলীর স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যু হয় বলে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান জানিয়েছেন। জমির উদ্দিন সরকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার, সাবেক মন্ত্রী ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির জ্যেষ্ঠ আইনজীবী হিসেবে দায়িত্বপালন করেছেন। জমির উদ্দিন সরকারের জানাযা গতকাল বিকেল ৫টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হয়। এরপর সংসদ ভবন চত্বরে তার লাশ দাফন করা হয়। জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখপ্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী জমির উদ্দিন সরকারের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে সুসংহত করা, সংসদীয় সংস্কৃতির বিকাশ এবং জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র পরিচালনায় জমির উদ্দিন সরকারের অবদান জাতি চিরকাল গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।
বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ ও সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের ইন্তিকালে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
শোকবার্তায় ডা. শফিকুর রহমান মরহুমের বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের কথা স্মরণ করে বলেন, “বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন একজন দেশবরেণ্য ও খ্যাতিমান সিনিয়র আইনজীবী। একই সাথে একজন পরিচ্ছন্ন ও দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ হিসেবে দীর্ঘদিন অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সুনামের সঙ্গে তিনি তার পেশাগত ও রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করেছেন।” তিনি আরও বলেন, “জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে দলমত নির্বিশেষে তিনি সবার কাছে সমাদৃত ও শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দসহ রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার ব্যক্তিদের প্রতি তিনি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল ছিলেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তিনি বিভিন্ন সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও রাজনৈতিক পরামর্শ দিয়েছেন। ডা. শফিকুর রহমান মরহুমের রূহের মাগফিরাত কামনা করে বলেন, “আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার সকল মানবিক ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দিয়ে তাকে জান্নাতুল ফেরদাউসের মেহমান হিসেবে কবুল করুন। এদিকে বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদের মৃত্যুতে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ, ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল, চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শোক জানিয়েছেন।
সুপ্রিম কোর্টের কার্যক্রম আধাবেলা বন্ধ
ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার স্মরণে গতকাল সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের কার্যক্রম অর্ধবেলা (দিনের দ্বিতীয় ভাগ) বন্ধ ছিলো। তার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। আজ সোমবার ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণসহ দেশব্যাপী বিএনপির পক্ষ থেকে একদিনের শোক কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। ঢাকাসহ সারা দেশের দলীয় কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন করা হবে ও নেতাকর্মীরা কালো ব্যাজ পরবে।
এদিকে রবিবার বিকেলে জাতীয় সংসদে মরহুমের দ্বিতীয় জানাযায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ মন্ত্রীপরিষদ, সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্য ও রাজনীতিবিদরা অংশ গ্রহণ করেন। জানাযার শুরুতেই মরহুম ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের সংক্ষিপ্ত জীবনী পাঠ করেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পীকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, এমপি। পরে বক্তব্য প্রদান করেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পীকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম, এমপি; জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেতা ডা. মো: শফিকুর রহমান এমপি, বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, এমপি; বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পীকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, এমপি; বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের চীফ হুইপ মোঃ নূরুল ইসলাম মনি, এমপি এবং পরিবারের পক্ষে মরহুমের ছেলে সংসদ-সদস্য ব্যারিস্টার মুহাম্মদ নওশাদ জমির এমপি।
স্পীকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম জানাযায় উপস্থিত সকলকে কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন বাংলাদেশের একজন কৃতী সন্তান। তার প্রয়ানে জাতীয় সংসদের প্রতিটি সদস্য বিহ্বল ও ভারাক্রান্ত হয়েছেন। তিনি ব্যক্তি জীবনে অমায়িক, সজ্জন সাধারণ মানুষের জন্য নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সাবেক স্পীকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আস্থা ভাজন ছিলেন। এসময় তিনি মরহুমের শোকসন্তপ্ত পরিরাবের প্রতি সমবেদনা জানান। এসময় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা, জাতীয় সংসদের চীফ হুইপ, বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনা করে শোক প্রকাশ, শ্রদ্ধা জ্ঞাপন এবং পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।
মরহুম ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদান করেন রাষ্ট্রপতির পক্ষে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব এএসএম বাহাউদ্দিন, জাতীয় সংসদের স্পীকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম, এমপি; বিএনপির পক্ষে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, এমপি; ডেপুটি স্পীকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, এমপি; চীফ হুইপ ও অন্যান্য হুইপবৃন্দ এবং সংসদ সচিবালয়ের পক্ষে ব্যারিস্টার গোলাম সরওয়ার ভুঁইয়া ও কর্মকর্তাবৃন্দ।
শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদান শেষে মরহুমের রূহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া ও মোনাজাত করা হয় এবং জানাযা শেষে জাতীয় সংসদ চত্বরের নির্ধারিত স্থানে তাকে সমাহিত করা হয়। এর আগে জোহরের নামাযের পর ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে তার প্রথম জানাযা হয়। এতে অংশ নেন আত্মীয়স্বজন, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও স্থানীয় মানুষ। বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে তার লাশ গ্রামের বাড়ি পঞ্চগড়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ব্যারিস্টার মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত আইনজীবী, রাজনীতিবিদ ও সাবেক স্পিকার। তিনি ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত অষ্টম জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০২ সালে রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ. কিউ. এম. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বও পালন করেন। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রতিষ্ঠালগ্নের অন্যতম নেতা এবং দীর্ঘদিন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার ১৯৩১ সালের ১ ডিসেম্বর তৎকালীন জলপাইগুড়ি জেলার (বর্তমান পঞ্চগড় জেলার) তেঁতুলিয়া উপজেলার নয়াবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মৌলভী আলী বক্স এবং মা বেগম ফখরুন্নেছা। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে সম্মান ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর এলএলবি সম্পন্ন করেন। পরে ১৯৬০ সালে আইন পেশায় যোগ দেন এবং ১৯৬১ সালে যুক্তরাজ্যে গিয়ে লন্ডনের লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল ডিগ্রি লাভ করেন। দেশে ফিরে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে সংবিধান, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইন বিষয়ে সুনামের সঙ্গে আইন পেশা পরিচালনা করেন। রাজনৈতিক জীবনে তিনি প্রথমে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উদ্যোগে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন এবং বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হন। তিনি একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং বিভিন্ন সময়ে ভূমি, শিক্ষা, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কসহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হন এবং ২৫ জানুয়ারি ২০০৯ পর্যন্ত এ পদে দায়িত্ব পালন করেন। স্পিকার হিসেবে সংসদ পরিচালনায় তার নিরপেক্ষতা, সংসদীয় রীতি-নীতি অনুসরণ এবং সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত। ২০০২ সালের ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
আইন ও আন্তর্জাতিক বিষয়েও তার বিশেষ আগ্রহ ছিল। তিনি আন্তর্জাতিক আইন, সমুদ্র আইন, জাতিসংঘ এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। পাশাপাশি তিনি নিজ জন্মভূমি পঞ্চগড়ে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার কলেজিয়েট ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষাক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বেগম নুর আখতারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের এক মেয়ে ও দুই ছেলে রয়েছে। তার দুই ছেলেই আইন পেশার সঙ্গে যুক্ত এবং ব্যারিস্টার হিসেবে সুপ্রিম কোর্টে আইন চর্চা করছেন।
বাংলাদেশের আইন, সংসদীয় গণতন্ত্র ও রাজনীতিতে ব্যারিস্টার মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকারের অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক ও আইনজীবী জীবনে তিনি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশ এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
সংসদে শোক, শ্রদ্ধা ও স্মৃতিচারণ : সাবেক স্পিকার, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারকে সততা, প্রজ্ঞা, শিষ্টাচার ও সংসদীয় গণতন্ত্রের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে স্মরণ করেছে জাতীয় সংসদ। শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা তাকে একজন সফল আইনজীবী, প্রজ্ঞাবান সংসদীয় ব্যক্তিত্ব, আপাদমস্তক ভদ্রলোক এবং দলের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ নেতা হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
গতকাল রবিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় তথা প্রথম বাজেট অধিবেশনের ২৩তম কার্যদিবসে তার মৃত্যুতে আনা শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে বিকাল ৩টায় অধিবেশন শুরু হয়।
বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সাবেক স্পিকার, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার পেশাগত ও রাজনৈতিক জীবনে সফল এবং বর্ণাঢ্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। তিনি পেশাগত জীবন, রাজনীতি ও সংসদীয় কর্মকাণ্ডে সততা, মানবিকতা এবং দায়িত্বশীলতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।
তিনি বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন ছয়বার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি এবং দেশের আইন অঙ্গনের একজন তারকা আইনজীবী ছিলেন।
বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দলীয় নেতাকর্মীরা যখন নানা আইনি জটিলতায় পড়তেন, তখন বারবার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিনের শরণাপন্ন হতে হতো। তিনি শুধু আইনি পরামর্শই দিতেন না, আদালতে দাঁড়িয়ে নির্যাতিত নেতাদের পক্ষে লড়াইও করতেন। তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে পারিশ্রমিক দেওয়ার বহু চেষ্টা করা হলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি। তিনি বলতেন, এটি তার নৈতিক দায়িত্ব এবং রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের জন্য কাজ করার সুযোগ।
তিনি বলেন, এই অবদান কখনো ভোলার নয়। তার সেই মানবিকতা স্মরণ করলে আজও চোখে পানি আসে। তার ঋণ পরিশোধ করার ক্ষমতা আমাদের নেই।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, স্পিকার হিসেবে তিনি সংসদকে প্রাণবন্ত করে তুলেছিলেন। আইন অঙ্গনে তিনি ছিলেন অনেকের শিক্ষক। তার ব্যক্তিত্ব, আচরণ ও কর্মপদ্ধতি অনুসরণীয়। তবে মানুষ হিসেবে ভুল-ত্রুটি থাকতেই পারে। মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, তিনি যেন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিনের সব ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দেন, তার কবরকে জান্নাতের নূরে আলোকিত করেন এবং তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন।
তিনি আরও বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিনের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে সবাই যেন নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে উদ্বুদ্ধ হয়। মৃত্যুর পর মানুষের ভালোবাসা ও দোয়া অর্জনই একজন মানুষের প্রকৃত সফলতা।
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন আপসহীন। তিনি সবসময় বলতেন, নির্বাচনের মধ্য দিয়েই গণতন্ত্রে পৌঁছাতে হয়। আইনের শাসন এবং গণতন্ত্রের প্রতি তার যে অবিচল আস্থা ছিল, তা বর্তমানে বিরল।
তিনি বলেন, জমির উদ্দিন সরকার একজন ‘সেলফ মেড ম্যান’। তিনি নিজের মেধা দিয়ে বড় হয়েছেন, সুদূর যুক্তরাজ্য থেকে ব্যারিস্টারি শেষ করে এসে কর্মজীবনে আর কখনো পেছনে ফিরে তাকাননি। তিনি উত্তরবঙ্গ ও ঢাকা উভয় জায়গাতেই নির্বাচিত হয়েছেন। সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও অভিভাবকতুল্য ছিলেন। সাধারণ মানুষের প্রতি তার ভালোবাসার কারণেই তিনি কোনোদিন কোনো নির্বাচনে পরাজিত হননি।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নীতি ও আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তিনি জাগোদল ও পরবর্তীতে বিএনপির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে যুক্ত ছিলেন উল্লেখ করে ফখরুল বলেন, তিনি দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন এবং যতবার বিএনপি সরকার গঠন করেছে, ততবারই তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, গতকাল রাতেও খবর নিয়েছিলাম তিনি হাসপাতালে। ভাবলাম সকালে দেখতে যাব, কিন্তু সেই সকাল আর আসেনি। ভোর ৪টা ১৫ মিনিটে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। শেষ সময়ে তাকে দেখতে না পারায় আমি নিজেকে অপরাধী মনে করছি।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ব্যারিস্টার সরকারের তিন সন্তানই আইন পেশার সঙ্গে জড়িত, যা আইনের প্রতি তার গভীর অনুরাগেরই বহিঃপ্রকাশ।
বিএনপি মহাসচিব স্মৃতিচারণ করে বলেন, নির্বাচনের আগে কারাগারে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারকে বলেছিলেন যেন গণতন্ত্র টিকে থাকে এবং গণতন্ত্রের পথেই তারা এগিয়ে চলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি সেই পথেই চলার চেষ্টা করেছেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন ছিলেন সততা ও পেশাগত সুনামের অনন্য উদাহরণ। দীর্ঘ আইনজীবী জীবনে তার বিরুদ্ধে কোনও ব্যক্তি, মক্কেল বা সহকর্মীর কাছ থেকে কখনও কোনও অভিযোগ শোনা যায়নি। দলের প্রতি তিনি ছিলেন শতভাগ নিবেদিতপ্রাণ।
তিনি বলেন, ‘তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন ভদ্রলোক। তাকে প্রায় সবসময়ই থ্রি-পিস স্যুটে দেখা যেত। তার পোশাক-পরিচ্ছদই যেন ব্যক্তিত্বের অংশ হয়ে উঠেছিল। একবার তার এলাকার একজন ভোটার তাকে পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা অবস্থায় দেখে চিনতেই পারেননি।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘স্পিকার, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি কিংবা আইনজীবী যে পরিচয়েই তাকে স্মরণ করি না কেন, তার সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান মানুষ। তিনি সংসদের স্ট্যান্ডিং কমিটির অন্যতম জ্যেষ্ঠ সদস্য ছিলেন। বয়সের কারণে এবার নিজে নির্বাচন না করে ছেলে ব্যারিস্টার নওশাদ জমিরকে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য দলের কাছে অনুরোধ করেছিলেন। আমার বিশ্বাস, তিনি নির্বাচন করলে জয়ী হতেন।’
তিনি আরও বলেন, প্রথা অনুযায়ী সংসদ ভবন প্রাঙ্গণেই তাকে দাফন করা হবে। ফলে শারীরিকভাবে না থাকলেও তিনি সংসদের সঙ্গেই থেকে যাবেন।
প্রবীণ রাজনীতিবিদ ড. খন্দোকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ঢাকা হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টে দূর থেকে হ্যাট, কোট আর ছাতা হাতে কাউকে দেখা গেলেই বোঝা যেত তিনি ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। তিনি তার মক্কেলদের বিষয়ে অত্যন্ত সিরিয়াস ছিলেন।’
আলোচনা শেষে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম বলেন, ‘জাতি আজ এক মহান রাজনীতিক ও সাদা মনের মানুষকে হারিয়েছে। তিনি এই চেয়ারে বসে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সংসদ পরিচালনা করেছেন। তার বিরুদ্ধে কখনো কোনো অভিযোগ শোনা যায়নি।’
ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, ৯০-এর গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পঞ্চম জাতীয় সংসদে আপনারা যারা এই সংসদকে সেই সময়ে যেহেতু একটি ফ্যাসিবাদী দল বিরোধী দলের ভূমিকায় ছিল, আমরা দেখেছি, তিনি অত্যন্ত যোগ্যতার সাথে, শান্তভাবে সেই দায়িত্ব পালন করে গিয়েছিলেন। তিনি একজন স্বনামধন্য আইনজীবী ছিলেন। ৬৬ বছর তিনি সুপ্রিম কোর্টে প্র্যাকটিস করেছেন। আমাদের সিনিয়র বলতেন, একজন ব্যারিস্টারকে তার বেশভূষা দেখে বহু দূর থেকে চেনা যায়। এরকম ব্যারিস্টার আমাদের দেশে যদি কয়েকজনের নাম বলা যায়, তার মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য হবেন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। তার সেই সুটেড-বুটেড যে অ্যাটায়ার ছিল, একটি হ্যাট, একটি ছাতা নিয়ে যেভাবে তিনি চলাফেরা করতেন, বহু দূর থেকেই বোঝা যেত তিনি একজন স্বনামধন্য আইনজীবী। তিনি শুধুমাত্র একজন আইনজীবী ছিলেন না, আমাদের আজকের যারা রাজনীতিবিদ রয়েছেন তাদের জন্য শিক্ষা, আজকে আমরা দেখি না ওনি যেভাবে বই লিখেছেন, ১২টি বই লিখেছেন। আইনজীবীদের মধ্যে সেই চর্চা, রাজনীতিবিদদের মধ্যে সেই লেখার চর্চাটা কমে গিয়েছে, সেক্ষেত্রে তিনি আমাদের জন্য উদাহরণ। তিনি একজন সৎ সন্তানের বাবা ছিলেন, তার দুই সন্তান আমার পরিচিত, তারা অত্যন্ত ভালো এবং দ্বীনদার, পরহেজগার রূপে আমি দেখেছি তাদেরকে।
শোক প্রস্তাবের আলোচনায় আরো বক্তব্য রাখেন বিএনপির এ এম মাহাবুব উদ্দিন খোকন, এনসিপির আখতার হোসেন।
শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনা শেষে মরহুমের সম্মানে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. কামরুজ্জামানের পরিচালনায় মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মুনাজাত করা হয়।
উল্লেখ্য, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার রোববার ভোর ৪টা ১৫ মিনিটে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।