সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ পলিসি অ্যান্ড গভর্নেন্স (সিআইপিজি) আয়োজিত সেমিনারে বিশিষ্টজনরা বলেছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং উপকারভোগী নির্বাচনে অনিয়মের কারণে দেশের দরিদ্র কৃষক, শ্রমিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির প্রত্যাশিত সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার দরকার।
গতকাল রোববার রাজধানীতে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সাবেক সিনিয়র সচিব মো. শফিউল্লাহ-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. আবু আহমেদ, মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ড. একেএম ওয়ারেসুল করিম, প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ, আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য জনাব নুরুল ইসলাম বুলবুল, সাবেক সিনিয়র সচিব ড. খ. ম. কবিরুল ইসলাম, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফোয়াদ, সাবেক সচিব ড. আবুল হোসেন প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সাবেক অতিরিক্ত সচিব ড. খুরশীদ আলম।
পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. আবু আহমেদ বলেন, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সুদের হার যৌক্তিক পর্যায়ে না আনলে প্রণোদনা কার্যকর হবে না এবং প্রকৃত উদ্যোক্তারা কাক্ষিত সুবিধা পাবেন না। ব্যাংকিং খাতে অপ্রয়োজনীয় সরকারি হস্তক্ষেপ পরিহারের আহ্বান জানিয়ে বলেন, অতিরিক্ত অর্থ ছাপিয়ে সরকারের ঋণ গ্রহণ মূল্যস্ফীতি আরও বাড়াবে, যার সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা খাতের মোট বরাদ্দের প্রায় ৬১ শতাংশ পেনশন, কৃষি ভর্তুকি ও অন্যান্য খাতে ব্যয় হয়; দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সরাসরি বরাদ্দ থাকে মাত্র ৩৯ শতাংশ।
তিনি অভিযোগ করেন, প্রকৃত উপকারভোগীদের নির্ভুল তালিকা না থাকায় রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্নীতির কারণে অনেক দরিদ্র ব্যক্তি তালিকাভুক্ত হতে পারেন না, আবার অযোগ্য ব্যক্তিরা সুবিধা ভোগ করেন। তিনি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও স্বচ্ছ উপকারভোগী তালিকা প্রণয়ন এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, সরকার বাজেট ঘোষণার আগেই জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নিয়ে বাজেট বাস্তবায়নের উদ্যোগ এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত বরাদ্দ উদ্বেগজনক বলে তিনি মন্তব্য করেন। দুর্নীতিকে তিনি এ খাতের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ বলেন, মূল্যস্ফীতি বর্তমানে দেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। আয় বৈষম্যের কারণে এর সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করতে হয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে। কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এ জনগোষ্ঠীকে আংশিক সুরক্ষা দিতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপনকালে প্রফেসর ড. ওয়ারেসুল করিম বলেন, জনগণের করের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকারের সর্বোচ্চ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। বিলাসী ব্যয়ের পরিবর্তে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন এবং কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার।
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়ে পর্যাপ্ত মূল্যায়ন বা গবেষণা হয়নি। এসব কর্মসূচির ফলে দারিদ্র্য কতটা কমেছে কিংবা উপকারভোগীদের ক্রয়ক্ষমতা কতটা বেড়েছেÍসে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য মূল্যায়নের অভাব রয়েছে। তিনি বলেন, একদিকে সামাজিক সহায়তা দেওয়া হলেও অন্যদিকে জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় সেই সহায়তার প্রকৃত সুফল অনেকাংশে নষ্ট হয়ে যায়।
সাবেক সিনিয়র সচিব ড. খ. ম. কবিরুল ইসলাম বলেন, স্বাধীনতার পর দেশে দারিদ্র্যের হার কমলেও আয় ও সম্পদের বৈষম্য বেড়েছে। বিশেষ করে চরাঞ্চলে এখনও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও শিক্ষা অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমান বয়স্ক ভাতার পরিমাণ জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। তাই উপকারভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির পরিবর্তে সহায়তার পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
ড. আবুল হোসেন বলেন, কাঠামোগত পরিবর্তন একদিনে সম্ভব নয়। তিনি উল্লেখ করেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) উল্লেখযোগ্য অংশ প্রতিবছরই বাস্তবায়িত হয় না, যা উন্নয়ন কার্যক্রমের দক্ষতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।
সাবেক সিনিয়র সচিব মো. শফিউল্লাহ বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরিণ অর্থনৈতিক বাস্তবতায় মূল্যষ্ফিতি সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার উপর মাত্রারিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক ন্যায় বিচার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের নীতিপত্র।
বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী, প্রান্তিক চাষী, প্রবীন, বিধবা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং অন্যান্য ঝুকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্যকারিতা, বরাদ্দের পর্যপ্ততা এবং সুশাসনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শুধু ভাতা দিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে দারিদ্র্যতা কমানো সম্ভব নয়। টেকসই দারিদ্রতা হ্রাসের জন্য প্রয়োজন দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা প্রদান, কৃষি ও শিল্পে বিনিয়োগ এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর করার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন।