নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার গালিমপুর এলাকায় বড়াল নদীর ওপর নির্মিত বেইলি ব্রীজটিতে ভারী যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণে বসানো উচ্চতা নিয়ন্ত্রণকারী লোহার গেট এখন নতুন করে দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি করেছে। গেট স্থাপনের পরও সেখানে কোনো সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, উচ্চতা নির্দেশক কিংবা প্রতিফলক (রিফ্লেক্টর) না থাকায় প্রায়ই চালকরা না বুঝেই গেটের সঙ্গে ধাক্কা দিচ্ছেন। এতে করে ধাক্কায় ধাক্কায় গেটের লোহার বিম বাঁকা হয়ে ব্রীজের উপর ঝুলে গেছে এবং দুইটি খুঁটি স্থানচ্যুত হওয়ায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ফলে ঝুঁকি নিয়েই ব্রীজটি পারাপার হচ্ছে পথচারী ও যানবাহন, তাই দ্রুত মেরোমতের দাবি স্থানীয়দের।

বাগাতিপাড়ায় ঝুকিপূর্ণ বেইলি ব্রীজ দিয়ে

নাটোরের বাগাতিপাড়ার ঝুকিপূর্ণ বেইলি ব্রীজ

সরেজমিনে দেখা যায়, বেইলি ব্রীজের প্রবেশমুখে যানবাহন চালকদের সতর্ক করার জন্য কোনো ধরনের সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, উচ্চতা-সীমা নির্দেশক বা সতর্কবার্তা নেই। বরং মূল প্রবেশপথে ঝুলতে দেখা যায় বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তির ছবি, ভর্তি কোচিংয়ের ব্যানার ও চিকিৎসকদের প্রচার-ফেস্টুন। চারপাশে ঘন গাছপালার ছায়া এবং এসব ব্যানার-ফেস্টুনে প্রবেশমুখ আংশিক ঢেকে থাকায় উচ্চতা নিয়ন্ত্রণকারী লোহার গেটটি দুর থেকে স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে না, ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেড়েছে।

সেতুর গালিমপুর প্রান্তে প্রবেশপথে স্থাপিত উচ্চতা নিয়ন্ত্রণকারী লোহার গেটের দুটি স্টিলের বিম একাধিকবার যানবাহনের ধাক্কায় বাঁকা হয়ে হেলে পড়েছে। গেটের দুটি খুঁটিও স্থানচ্যুত হয়ে গেছে। দুর্ঘটনা এড়াতে স্থানীয়রা খুঁটি দুটি দড়ি দিয়ে পাশের গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখেছেন। বর্তমানে ছোট-বড় যানবাহনগুলো ধীরে ধীরে ও সতর্কতার সঙ্গে সেতু পার হচ্ছে। এছাড়া সেতুর ২৪৬টি পাটাতনের মধ্যে অধিকাংশই দীর্ঘদিনের ব্যবহারে ক্ষয়প্রাপ্ত। কোথাও পাটাতন ফুটো হয়ে গেছে, কোথাও বড় ধরনের গর্ত সৃষ্টি হয়েছে, আবার কোনো কোনো স্থানে পাটাতনের অংশ ভেঙে ফাঁকা হয়ে রয়েছে। এমন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার মধ্য দিয়েই প্রতিদিন শত শত যানবাহন ও পথচারী সেতুটি ব্যবহার করছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জনসাধারণের চলাচলের জন্য সেতুটি উন্মুক্ত করা হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে ঝড়, অতিরিক্ত ভারী যান চলাচল এবং পাটাতন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় একাধিকবার সংস্কার করা হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালে সেতুর ওপর ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখতে দুই প্রান্তে উচ্চতা নিয়ন্ত্রণকারী লোহার গেট স্থাপন করে সড়ক ও জনপথ বিভাগ।

কিন্তু গেট স্থাপনের পর কোনো ধরনের আগাম সতর্কতামুলক সাইনবোর্ড বা উচ্চতা-সীমা নির্দেশক বসানো হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে বিশেষ করে বাহিরের এলাকার ট্রাক ও বাসচালকরা গেটটি বুঝতে না পেরে ধাক্কা দেন। এতে গেটের লোহার কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, স্থানীয়দের আশঙ্কা দ্রুত মেরামত ও প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সেতু সংলগ্ন ব্যবসায়ী নির্মল কুমার (৫০) বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকি নিয়েই এই বেইলি সেতু দিয়ে যানবাহন ও পথচারীরা চলাচল করছেন। বাগাতিপাড়া উপজেলার পাশাপাশি রাজশাহীর বাঘা ও চারঘাট উপজেলার মানুষের যোগাযোগের ক্ষেত্রেও সেতুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সপ্তাহে দুই দিন গরুর হাট বসে, তখন অসংখ্য গরু ব্যবসায়ী এই সেতু ব্যবহার করেন। কিন্তু উচ্চতা নিয়ন্ত্রণকারী লোহার গেটটি বসানোর পর কোনো সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড না থাকায় আর গেটটি নিচু হওয়ায় প্রায়ই যানবাহন গেটের সঙ্গে ধাক্কা খায়। এতে গেটটি বাঁকা হয়ে ধনুকের মতো হয়ে গেছে। আবার বড় যানবাহনগুলোকে এই পথ ব্যবহার না করে অনেক দূর ঘুরে গন্তব্যে যেতে হচ্ছে। এতে সময় ও পরিবহন ব্যয় দুটিই বাড়ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী বাবু আলী (৩২) বলেন, গালিমপুর দিকের প্রবেশমুখে স্থাপিত উচ্চতা নিয়ন্ত্রণকারী লোহার গেটের দুটি খুঁটিই আগের অবস্থান থেকে সরে গেছে। এতে গেটটি সেতুর ওপর হেলে পড়েছে। দুর্ঘটনা এড়াতে আমি ও কয়েকজন মিলে খুঁটি দুটি দড়ি দিয়ে পাশের গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখেছি। কিন্তু এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি আরও বলেন, সেতুর পাটাতনের অবস্থাও খুবই নাজুক। কোথাও পাটাতন ফুটো হয়ে গেছে, কোথাও বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে, আবার কোথাও পাটাতনের অংশ ফাঁকা হয়ে আছে। তাই দুর্ঘটনা এড়াতে দ্রুত উচ্চতা নিয়ন্ত্রণকারী লোহার গেটটি মেরামত এবং সেতুর ক্ষতিগ্রস্ত পাটাতনগুলো সংস্কার করা।

এ বিষয়ে বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দেবাশীষ বসাক বলেন, আমি নিজেও জায়গাটি দেখেছি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখে দ্রুত সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

নাটোর সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল হাসান সরকার বলেন, আমাদের প্রতিনিধিরা ব্রীজটি দেখে আসবেন। তারপরে অস্থায়ী ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, মন্ত্রী মহোদয় আসলে পরবর্তীতে আলোচনা করে স্থায়ী সমাধানের চেষ্টা করা হবে।