গত ছয় মাসে গাজীপুর মহানগরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের পুলিশ কমিশনার মোঃ ইসরাইল হাওলাদার।
তিনি বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, মাদকবিরোধী অভিযান, নিষিদ্ধ সংগঠনের তৎপরতা দমন, ছিনতাই ও সন্ত্রাস প্রতিরোধে জিএমপি সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করছে। কোনো ধরনের সন্ত্রাস, নাশকতা কিংবা নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রম বরদাশত করা হবে না।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গাজীপুরের প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি গত ছয় মাসের (জানুয়ারি-জুন ২০২৬) আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেন এবং সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার জানান, গত ছয় মাসে গাজীপুর মেট্রোপলিটন এলাকায় মোট ১ হাজার ৮৫৪টি মামলা রুজু হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা ২০টি, ডাকাতি ৭টি, ছিনতাই ২৮টি, সিঁধেল চুরি ১৬টি, নারী ও শিশু নির্যাতনের ১৭৬টি, মাদকের ৮১২টি, অস্ত্রের ৬০টি এবং অন্যান্য অপরাধে ৭৩৫টি মামলা রয়েছে।
তিনি জানান, এ সময়ে বিভিন্ন অপরাধে মোট ৩ হাজার ২১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯৮৮ জন মাদক ব্যবসায়ী, ৯০১ জন মাদকসেবী, ৩৭৭ জন অস্ত্র মামলার আসামি, ৩৫৪ জন ডাকাতির প্রস্তুতি মামলার আসামি, ৪৬ জন ছিনতাইকারী, ২৩ জন ডাকাতিসহ অন্যান্য মামলার ৫২৮ জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ কমিশনার আরও জানান, গত ছয় মাসে ১০টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, ২০ রাউন্ড গুলি, ৪টি ম্যাগাজিন, বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র, ৫১ হাজার ৫৬০ পিস ইয়াবা, ৩৫৭ কেজি ৩৬৫ গ্রাম গাঁজা, ১ কেজি ৯৬৫ গ্রাম হেরোইন, ৫৩০ পিস প্যাথেডিন, ২৭৬ বোতল ফেন্সিডিল, ৪৬ লিটার দেশীয় মদ এবং ১৫১ লিটার বিদেশি মদ উদ্ধার করা হয়েছে।
নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের তৎপরতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সম্প্রতি গাজীপুর মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গসংগঠনের ঝটিকা মিছিলের চেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে। এসব ঘটনায় সদর, বাসন, কোনাবাড়ী, গাছা ও টঙ্গী পশ্চিম থানায় মোট ৭টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় এ পর্যন্ত ৯৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া মিছিলে অংশগ্রহণকারী, অর্থদাতা ও সহযোগী হিসেবে আরও শতাধিক ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো সংগঠনের প্রকাশ্য বা গোপন কার্যক্রম, অর্থায়ন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণাও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে অপরাধ। যারা এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
টঙ্গীর পাগাড় বিসিক এলাকায় ঝুট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে মোটরসাইকেল মহড়ার ঘটনায় জিএমপির অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, ওই ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করে ইতোমধ্যে ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মহড়ায় অংশ নেওয়া বাকি ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার কাজ চলছে। ভবিষ্যতে শক্তি প্রদর্শন বা আধিপত্য বিস্তারের কোনো চেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা হবে।
মাদকবিরোধী অভিযানের বিষয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, টঙ্গীসহ মহানগরের বিভিন্ন বস্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মাদক কারবারের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে ধারাবাহিক অভিযান চলছে। মাজার বস্তি, কেরানীর টেক, ব্যাংকের মাঠ ও এরশাদ নগর বস্তিতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে শীর্ষ মাদক কারবারিদের সম্পদের অনুসন্ধান করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।
ছিনতাই প্রতিরোধে বিশেষ চেকপোস্ট, ব্লক রেইড, টহল ও বিশেষ অভিযান পরিচালনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া অধিকাংশ ছিনতাইকারীই পুনরায় একই অপরাধে জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইনে মামলা পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
হানি ট্র্যাপ ও অপহরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার, দ্রুত উদ্ধার অভিযান এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রমের ফলে এ ধরনের অপরাধ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।
বেওয়ারিশ লাশ উদ্ধারের ঘটনা নিয়েও ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরে পুলিশ কমিশনার জানান, ২০২৩ সালে ৯৪টি, ২০২৪ সালে ৯৬টি এবং ২০২৫ সালে ৮১টি হত্যা মামলা হলেও চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে হত্যা মামলা হয়েছে ২০টি। এর মধ্যে মাত্র একটি লাশের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।
কিশোর গ্যাং দমনে জিএমপির বিশেষ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, মহানগরের কিশোর গ্যাং সদস্যদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে তাদের বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা হবে।
তিনি বলেন, 'গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল সহযোগিতা এবং নাগরিকদের সচেতন অংশগ্রহণ আমাদের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করবে।'
সংবাদ সম্মেলনে জিএমপির অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন ও অর্থ) মোহাম্মদ তাহেরুল হক চৌহান, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন, উপ-পুলিশ কমিশনার (সদর দপ্তর ও অর্থ) মোঃ জাহিদ হোসেন ভূঁইয়া, পিপিএম, উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) এস এম আশরাফুল আলম পিপিএম, উপ-পুলিশ কমিশনার (সিটিএসবি) মোহাম্মদ মহিউল ইসলাম, উপ-পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম-নর্থ) মোঃ শফিকুল ইসলাম, উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিবি-সাউথ) সাহেব আলী পাঠান, উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিবি-নর্থ) অশোক কুমার পাল পিপিএম, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (সদর দপ্তর ও অর্থ) ইয়াসমীন সাইকা পাশা, স্টাফ অফিসার টু পুলিশ কমিশনার খন্দকার জালাল উদ্দিন মাহমুদ এবং বাসন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহা. হারুন-অর-রশিদ।
এ সময় বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক এবং অনলাইন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা অংশ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা, মাদক, কিশোর গ্যাং, নিষিদ্ধ সংগঠনের তৎপরতা, ছিনতাই, হানি ট্র্যাপসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করেন। পুলিশ কমিশনার এসব প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর দেন এবং অপরাধ দমনে জিএমপির চলমান কার্যক্রম সম্পর্কে সাংবাদিকদের অবহিত করেন।