বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি বলেছেন, জনগণের রায় বাস্তবায়নে শ্রমিক জনতার আন্দোলন অব্যাহত থাকবে এবং সরকার জনগণের গণভোটের রায়কে সম্মান না করলে দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চলমান থাকবে।

তিনি শুক্রবার (১৯ জুন) বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন চট্টগ্রাম মহানগরের উদ্যোগে নগরের ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ইউনিট প্রতিনিধি সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।

অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, দেশের কল্যাণ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য আল্লাহর বিধান ও ইসলামী আদর্শ অনুসরণের বিকল্প নেই। মানব রচিত মতবাদ দিয়ে জনগণের প্রকৃত মুক্তি ও শান্তি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। শ্রমজীবী ও খেটে খাওয়া মানুষদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, দেশের শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষায় সংগঠিত শক্তি গড়ে তুলতে হবে। ইসলামের দাওয়াত মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়ে আদর্শিক ও নৈতিক নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে। তিনি দাবি করেন, শ্রমিকদের সমর্থন ও অংশগ্রহণের মাধ্যমেই দেশে ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব।

প্রস্তাবিত বাজেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাজেটকে আরও জনবান্ধব ও শ্রমিকবান্ধব করা প্রয়োজন। বেকারত্ব দূরীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় তিনি হতাশা প্রকাশ করেন। তবে সরকারের যেকোনো ভালো উদ্যোগকে স্বাগত জানানো হবে বলেও উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ভালো কাজের প্রশংসা এবং ভুল সিদ্ধান্তের সমালোচনা—দুটিই জামায়াতে ইসলামীর নীতিগত অবস্থান। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে সরকার ও বিরোধী পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক ও চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি এস এম লুৎফর রহমান'র সভাপতিত্বে এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা মুহাম্মদ শাহাজাহান, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান, নগর জামায়াতে ইসলামীর আমির মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম, সেক্রেটারি অধ্যক্ষ নুরুল আমিন, ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মজিবুর রহমান ভূঁইয়া ও মুহাম্মদ ইসহাক, নগর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি ফয়সাল মুহাম্মদ ইউনুস ও অধ্যক্ষ খায়রুল বাশার।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মাওলানা মুহাম্মদ শাহাজাহান শ্রমিক সমাজকে শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আদর্শিক আন্দোলনে সংখ্যার চেয়ে মানসম্পন্ন ও যোগ্য কর্মী গড়ে তোলাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য প্রত্যেক কর্মীকে আত্মগঠনের মাধ্যমে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। আত্মগঠনের ক্ষেত্রে পবিত্র কোরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক, কিয়ামুল লাইল, জ্ঞান অর্জনের প্রচেষ্টা এবং ধৈর্য ধারণের শিক্ষা অনুসরণ করতে হবে। মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ অনুসরণ করে শ্রমিক নেতাকর্মীদের সমাজে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিতে হবে।

তিনি বলেন, সৎ, দক্ষ ও আদর্শিক নেতৃত্ব তৈরির মাধ্যমেই শ্রমিক সমাজের কল্যাণ এবং কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে। এ লক্ষ্যে শ্রমিক ময়দানে কর্মরত সকল নেতাকর্মীকে আত্মশুদ্ধি ও আত্মগঠনের ধারাবাহিক চর্চা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।

ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি এডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, শ্রমিকেরা আল্লাহর বন্ধু। শ্রমজীবী মানুষকে আল্লাহর রঙে রঙিন করা এবং ইসলামী আন্দোলনের সত্য ও মুক্তির পথে নিয়ে আসাই আমাদের অন্যতম দায়িত্ব। দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শ্রমিক জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করতে পারলেই ইসলামী আন্দোলনের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।

তিনি বলেন, সমাজের সবচেয়ে বেশি সুবিধাবঞ্চিত ও দুঃখী মানুষেরাই শ্রমিক। দেশের উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও অর্থনীতিতে শ্রমিকদের অবদান সবাই স্বীকার করলেও অধিকার প্রদানের ক্ষেত্রে তারা সবসময় বঞ্চিত থাকে। শ্রমিকের অধিকারের প্রশ্ন এলে কেউ তাদের পাশে দাঁড়ায় না। স্বাধীনতার পর বহু সরকার ক্ষমতায় এলেও শ্রমিকবান্ধব শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের আন্দোলন মূলত ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন। ট্রেড ইউনিয়নের মাধ্যমেই শ্রমিক সমস্যার সমাধান করতে হবে। ইসলামী আন্দোলনের গণভিত্তি শক্তিশালী করতে হলে শ্রমিক ময়দানে আরও বেশি ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তুলতে হবে। বর্তমানে ট্রেড ইউনিয়নভিত্তিক শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন অন্যতম বৃহৎ সংগঠন। প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে পেশাভিত্তিক ট্রেড ইউনিয়নকে শক্তিশালী করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

সভাপতির বক্তব্যে এস এম লুৎফর রহমান বলেন, দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী ও প্রধান সমুদ্রবন্দরনির্ভর নগর হওয়া সত্ত্বেও চট্টগ্রামকে দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন ও বরাদ্দের ক্ষেত্রে বঞ্চিত করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে চট্টগ্রাম বন্দরকে লুটপাটের কেন্দ্র বানানো হয়েছিল এবং বর্তমানে টেন্ডার ছাড়াই বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে, যা শ্রমিক-জনতাকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিহত করা হবে।

তিনি বিপিসির কেন্দ্রীয় কার্যালয় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় স্থানান্তরের যেকোনো উদ্যোগের বিরোধিতা করেন এবং দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে চট্টগ্রামে মেয়র ও কাউন্সিলর নির্বাচনের দাবি জানান। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, নিষিদ্ধ শ্রমিক লীগের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও ইসলামী শ্রমনীতি বাস্তবায়নে চট্টগ্রাম থেকেই দেশব্যাপী জাগরণ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

নগরীর সাধারণ সম্পাদক আবু তালেব চৌধুরী'র সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য রাখেন নগরীর সহ-সভাপতি নজির হোসেন ও মকবুল আহমেদ ভূঁইয়া প্রমুখ।