দেশে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার যে কোনো চেষ্টা জনগণ মেনে নেবে না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি। তিনি বলেন, সারাদেশে চাঁদাবাজি বন্ধ করুন, মানুষের শান্তি ফিরে আসুক। তিনি বলেন, যে দল নিজ দলের কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে তারা দেশে সুশাসন দিতে পারবে। আমরা এদেশ শাসন করতে চাই না, আমরা এদেশের জনগণের সেবা করতে চাই। তিনি বলেন, একটা বড় বাজেট দেওয়া হয়েছে। অসুবিধা নাই, বাজেট দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের, বাস্তবায়ন করার দায়িত্বও সরকারের। শুধু এতটুকু বলবো, গত সাড়ে ১৫ বছরে এই বাজেট থেকে যেভাবে আওয়ামী লীগ আর তার দোসর ২৯ লাখ কোটি টাকা চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল, সেই পথে আপনারা হাঁটবেন না। তবে কীভাবে আস্থা রাখব? কারণ সরকার গঠন করার আগে এবং পরে আপনারা তো চাঁদাবাজদের হাত আটকাতে পারেন নাই! একটা চাঁদাবাজকে আপনারা শাস্তির আওতায় আনেন নাই। ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ করেন নাই, বরং তার মিটার আগের থেকে বেড়ে গেছে। যদি এই অবস্থা জারি থাকে, তাহলে জনগণ জনগণের জায়গায় তার ভাগ্য নিয়ে হুমড়ি খাবে। আর কিছু দল, দলকানা কিছু মানুষ এবং কিছু গোষ্ঠীর হয়তো ভাগ্যের পরিবর্তন হবে। বাংলাদেশ আর এটা দেখতে চায় না। তিনি আরও বলেন, যারা জনগণের রায়কে সম্মান করে না, তারা প্রকৃত গণতন্ত্রে বিশ্বাসী হতে পারে না। যেহেতু প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে, তাই গণভোটে অনুমোদিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করা সরকারের দায়িত্ব। এখনো সময় আছে, জনগণের রায়কে সম্মান করুন, গণভোটের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করুন। অন্যথায় জনগণের মতামত অগ্রাহ্য করে জোর করে শাসনব্যবস্থা চালাতে চাইলে জনগণ আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের দাবি প্রতিষ্ঠা করবে ইনশাআল্লাহ। গতকাল শনিবার সকালে খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতির মিলনায়তনে খুলনা জেলা জামায়াতে ইসলামীর তারবিয়াতসহ রুকন সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ সব কথা বলেন।

জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও খুলনা জেলা আমীর মাওলানা মুহা. এমরান হুসাইনের সভাপতিত্বে ও সেক্রেটারি মুন্সি মিজানুর রহমানের পরিচালনায় বিশেষ অতিথি ছিলেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও খুলনা অঞ্চল পরিচালক অধ্যক্ষ মুহাম্মদ ইজ্জত উল্লাহ এমপি। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও খুলনা জেলা নায়েবে আমীর মাওলানা গোলাম সরোয়ার ও অধ্যক্ষ মাওলানা কবিরুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি মুন্সী মঈনুল ইসলাম, এডভোকেট মুস্তাফিজুর রহমান ও অধ্যাপক মিয়া গোলাম কুদ্দুস, খুলনা জেলা কর্মপরিষদ সদস্য শেখ সিরাজুল ইসলাম, মাওলানা আমিনুল ইসলাম, অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা আল মুজাহিদ, এডভোকেট আবু ইউসুফ মোল্লা, স. ম এনামুল হক, এডভোকেট লিয়াকত আলী, মিয়া মুজাহিদুল ইসলাম, মুহা. আশরাফুল আলম প্রমুখ।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের মাধ্যমে দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে উল্লেখ করে বলেন, জেলা পরিষদ, সিটি কর্পোরশন সর্বশেষ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষেও প্রশাসক পদে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যা একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টারই অংশ। তিনি বলেন, দেশের মানুষ অনির্বাচিত প্রশাসক নয়, বরং ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি দেখতে চায়।

ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াতের নায়েবে আমীর বলেন, শেখ মুজিবুর রহমান বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একদলীয় শাসন চালু করেছিলেন, কিন্তু তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। দেশের জনগণ কখনোই একদলীয় শাসনব্যবস্থা মেনে নেয়নি এবং ভবিষ্যতেও নেবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

গণভোটের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে। তাই জনগণের রায়কে সম্মান জানিয়ে সকল সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা উচিত। অন্যথায় জনগণের মতামত উপেক্ষা করলে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সৎ যোগ্য নাগরিক তৈরির মাধ্যমে মানবিক দেশপ্রেমিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে। পাশাপাশি অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাজপথে অবদান রেখেছে। এজন্য নেতৃবৃন্দকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। গত নির্বাচনকে দেশের জনগণ ভোট দিলেও ইঞ্জিনিয়ারিং করে ক্ষমতায় যেতে দেওয়া হয়নি। সংসদে কয়েকজন মন্ত্রী ও এমপি উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী ভয় পায় না। নতুন করে ফ্যাসিবাদী আচরণ করলে জনগণকে সাথে নিয়ে রুখে দিবো। তিনি খুলনার সংগঠনকে আরও মজবুত করার আহ্বান জানান।

অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, “জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশকে একটি ইনসাফভিত্তিক ও কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীতে জামায়াতের প্রতি মানুষের আগ্রহ ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই ভালবাসার আলোকে দেশপ্রেমিক জনতাকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। সমাজ পরিবর্তনের আগে নিজেকে পরিবর্তন করতে হবে। পরিবার পরিজনকে ইসলামের আলোকে আদর্শবান সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তাহলে দেশ জাতি ও সমাজ উপকৃত হবে।”

তিনি বলেন, “আমাদের উপর সীমাহীন জুলুম নিপীড়ন চালানো হয়েছে। শেষ পর্যন্ত আমাদেরকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু আমরা আল্লাহর উপর ভরসা করেই দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে কাজ করছি। তাই আল্লাহ পাক আমাদেরকে কাজের সুযোগ করে দিয়েছেন। সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে জামায়াতের রুকনদেরকে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করতে হবে। পতিত ফ্যাসিস্টদের ষড়যন্ত্র রুখে দিতে দেশপ্রেমিক জনতাকে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।”

অধ্যক্ষ মো. ইজ্জত উল্লাহ বলেন, “বিশ্ব মানবতার ধর্ম হচ্ছে ইসলাম। মানবতার মুক্তির সনদ মহাগ্রন্থ আল কুরআন ও বিশ্বনবী (সা.) এর হাদীস অনুসরণের মধ্যে মানবতার মুক্তি ও কল্যাণ নিহিত। যুগে যুগে প্রমাণিত হয়েছে ইসলাম ছাড়া সামাজিক সুবিচার ও স্বাধীনতা অন্য কিছু দিতে পারবেনা। তাই দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে রুকনদেরকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। মনে রাখতে হবে আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে মানবতার কল্যাণ সাধন করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। প্রমাণিত হয়েছে জুলুম-নিপীড়ন, হামলা-মামলা, ফাঁসির রশি আমাদের কাঙ্খিত লক্ষ্যপূরণ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি, পারবেও না কোনোদিন।” তিনি বলেন, দ্বীন কায়েমই আমাদের একমাত্র জীবনদ্দেশ্য। তাই আমাদেরকে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ঈমানের ওপর অবিচল থেকে দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে গতিশীল ও বেগবান করতে হবে। ফ্যাসিস্ট শক্তির পতন ঘটাতে যে স্বপ্ন নিয়ে আমাদের ছাত্র সমাজ বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছে, সেই বৈষম্যহীন সমাজ ও বেকারত্বহীন দেশ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।”