• সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় সংসদ অধিবেশনে ভোটাভুটি
  • বঙ্গভবনে আজ অফিস করবেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি

নতুন রাষ্ট্রপতির খোঁজ শুরু করছে বিএনপি। দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি কাকে বানানো হবে তা নিয়ে শুরু হয়েছে বিচার বিশ্লেষণ। এজন্য অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার দিকেও নজর রাখা হচ্ছে। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনয়ন দেয়।

কিন্তু দায়িত্ব নেয়ার পর বিএনপির বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেয়া এবং কয়েকটি বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে ৭ মাসের মাথায় বিএনপির সংসদ সদস্যদের অনাস্থার কারণে তাকে পদত্যাগ করতে হয়। অতীতের এসব তিক্ত অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখেই বিএনপি আগামীতে যিনি রাষ্ট্রপতি হবেন তার বিষয়ে খোঁজ খবর নিয়েই এগুচ্ছে ।

বিএনপির একধিক সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদে কাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে, সে সিদ্ধান্ত দলই আলোচনার মাধ্যমে নেবে। দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হলে প্রার্থীও দলেরই হবেন। এরপর নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে বিষয়টি জাতীয় সংসদে ভোটের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হবে। রাষ্ট্রপতির মনোনয়ন বিএনপির ভেতর থেকেই হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তারা।

এদিকে আগামী সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য সংসদ অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হচ্ছেন তা অনেকটা নিশ্চিত করেছেন আইনমন্ত্রী। সংসদে সংখ্যা গরিষ্ঠ দল হিসেবে ভোটে বিএনপি একক ভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হবে এমনটা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান গতকাল শনিবার বলেছেন, সেপ্টেম্বরের সংসদ অধিবেশনে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন, বিশেষ অধিবেশন ডেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

তিনি বলেন, সংবিধানের ১২৩ এর (২) অনুচ্ছেদ অনুসারে পদত্যাগের মধ্যে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত সময় আছে। সুতরাং বিশেষ অধিবেশন ডাকার মত কোনো পরিস্থিতি এখন তৈরি হয়নি। যেহেতু ১৫ জুলাই থেকে ৬০ দিনের মধ্যে আমাদের পরবর্তী অধিবেশন হওয়ার কথা সাংবিধানিকভাবে; আশা করি, সেই অধিবেশনে এটা করা সম্ভব হবে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে প্রস্তুতি চলছে :

মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছেন জাতীয় সংসদের বর্তমান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন তিনি। আর এরপর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নতুন রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন, তা নিয়ে জোর আলোচনা। বিভিন্ন মহলে নানা জনের নাম আলোচনায় থাকলেও, বিএনপি দলীয় নেতৃত্ব থেকেই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে চায়। তবে দলটির নীতি-নির্ধারণী ফোরামে আলোচনা শেষে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সরকার ও বিএনপির নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র জানিয়েছে, বাইরে থেকে নয়, বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্ষদ জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য থেকেই দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হতে পারেন। যদিও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত দলীয় ফোরামে আলোচনা হয়নি। ওই সূত্র জানিয়েছে, সদ্য পদত্যাগী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের উত্তরসূরি নির্বাচন নিয়ে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে প্রস্তুতি চলছে অত্যন্ত সন্তর্পণে।

দলের শীর্ষ নেতাদের মতে, রাষ্ট্রপতি হিসেবে এমন একজনকে বেছে নেওয়া উচিত, যিনি গ্রহণযোগ্য, নৈতিকতা-সম্পন্ন, অভিজ্ঞ এবং দলের প্রতি বিশ্বস্ত। রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দায়িত্ব গ্রহণের জোর আলোচনা আছে। এছাড়াও স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান ও বেগম সেলিমা রহমানের নামও বিভিন্ন মহলে আলোচনায় রয়েছে।

এর বাইরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং দলের ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরীর নামও সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে আলোচনায় এসেছে। তবে বিএনপির নেতাদের একটি বড় অংশের মত, রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে কাউকেই বেছে নেওয়া উচিত।

‘বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে। সেখানে বিএনপি যেহেতু সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল, তাই স্বাভাবিকভাবেই দলটির মনোনীত প্রার্থীই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।

তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রপতি এমন একজন হওয়া উচিত, যিনি দলের প্রতি বিশ্বস্ত, পরীক্ষিত এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শের অনুসারী। তার ভাষ্যমতে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে পক্ষ-বিপক্ষ সবার মধ্যেই পারস্পরিক সম্মানবোধ ও রাজনৈতিক নৈতিকতা বজায় থাকে।

সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল আরও বলেন, পেশাজীবীরা সাধারণত নির্দিষ্ট পরিসরে কাজ করেন। কিন্তু একজন রাজনীতিবিদ যেমন সাধারণ মানুষের সঙ্গে চায়ের দোকানে বসতে পারেন, তেমনি রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতায় বঙ্গভবনেও অংশ নিতে পারেন। এ ধরনের গুণাবলি ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি বিএনপিতে রয়েছে।

অন্যদিকে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, সংবিধানে এ বিষয়ে স্পষ্ট বিধান রয়েছে। রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।

তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রপতি পদে কাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে, সে সিদ্ধান্ত দলই আলোচনার মাধ্যমে নেবে। দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হলে প্রার্থীও দলেরই হবেন। এরপর নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে বিষয়টি জাতীয় সংসদে ভোটের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হবে। রাষ্ট্রপতির মনোনয়ন বিএনপির ভেতর থেকেই হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য।

যদিও বিএনপির ভেতরে রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পক্ষে জোর মত রয়েছে, তবুও ভূ-রাজনৈতিক এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক সমীকরণের কারণে দলীয় বলয়ের বাইরে থাকা কোনো গ্রহণযোগ্য অরাজনৈতিক ব্যক্তির নামও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

তবে শেষ পর্যন্ত পরবর্তী রাষ্ট্রপতি পদে কাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে, সেই সিদ্ধান্ত আসবে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন স্থায়ী কমিটির বৈঠক থেকেই। সেই সিদ্ধান্তের দিকেই এখন তাকিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন।

মন্ত্রিপরিষদেও গেজেট প্রকাশ:

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। গতকাল শনিবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে।

এতে বলা হয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ২৪ জুলাই ২০২৬ তারিখে রাষ্ট্রপতির পদ ত্যাগ করায় সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বীর বিক্রম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।

বঙ্গভবনে অফিস করবেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি:

নতুন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন জানিয়েছেন, তিনি নিয়মিত দাফতরিক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন বঙ্গভবনে। তবে বাসস্থানের বিষয়ে তিনি সংসদ ভবনের আশেপাশের এলাকায় স্পিকারের নির্ধারিত বাসভবনেই থাকবেন। এদিকে শুক্রবার বিকেল থেকেই সংসদ প্রাঙ্গণে স্পিকারের বাসভবন ও এর চারপাশের নিরাপত্তায় রাষ্ট্রপতির জন্য নিয়োজিত বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

জাতীয় স্মৃতি সৌধ ও জিয়া ও খালেদা জিয়ার কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন আজ:

দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কর্মদিবসে আজ রোববার শ্রদ্ধা নিবেদন ও জিয়ারত কর্মসূচি রয়েছে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির। বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান জানান, রোববার সকাল ১১টা ৩০ মিনিট ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ সাভারে জাতীয় স্মৃতি সৌধে বীর শহীদদের জাতীয় স্মৃতি স্তম্ভের পুস্তক অর্পণ করবেন এবং সাড়ে ১২টা ৩০ মিনিট শেরে বাংলা নগরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধান মন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং জিয়ারত করবেন।

দায়িত্ব গ্রহণের পর আলোচনা ছিল তিনি কোথায় থাকবেন। তবে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি জানিয়েছেন, বঙ্গভবনে অফিস করলেও তিনি থাকবেন সংসদ এলাকায় স্পিকারের জন্য নির্ধারিত বাসভবনে।

আজ বঙ্গভবন ছেড়ে গুলশান বাসায় উঠবেন মো. সাহাবুদ্দিন

রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করা মো. সাহাবুদ্দিন বঙ্গভবন ছেড়ে যাচ্ছেন আজ। বিতর্কিত এ রাষ্ট্রপতি কবে বঙ্গভবন ছেড়ে কোথায় উঠবেন তা নিয়ে সবার মাঝে জল্পনা-কল্পনা ছিল। সাবেক এ রাষ্ট্রপতির অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারী সূত্র জানায়, গত বুধবার থেকে রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত জিনিসপত্র রাজধানীর গুলশানে তার নিজ ফ্ল্যাটে নেওয়া হচ্ছে। রোববার তিনি বঙ্গভবন ছেড়ে যাবেন।

এ বিষয়ে সাহাবুদ্দিনের ব্যক্তিগত সহকারী সাগর হোসেন বলেন, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন শুক্রবার পদত্যাগ করেছেন। তিনি রোববার দুপুর নাগাদ বঙ্গভবন ছেড়ে যাবেন। তিনি গুলশানে নিজের ব্যক্তিগত বাসায় উঠবেন। এজন্য তার ব্যক্তিগত মালামাল সেখানে নেওয়া হচ্ছে।