বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের শিক্ষা এবং মানবিক দায়িত্ব। জনগণের দুঃসময়ে পাশে থাকা জামায়াতে ইসলামীর নৈতিক অঙ্গীকার। আল্লাহ তাআলা সুযোগ দিলে ভবিষ্যতেও দলটি অসহায় মানুষের কল্যাণে আরও ব্যাপকভাবে কাজ করে যাবে।

গতকাল শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রাম মহানগরীর চান্দগাঁও থানার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের টেকবাজার এলাকায় অতিবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত নারী-পুরুষের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণকালে আয়োজিত এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আপনাদের জন্য সামান্য কিছু খাদ্যসামগ্রী নিয়ে এসেছি। প্রকৃতপক্ষে এগুলো আপনাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পৌঁছে দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তব সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা তা করতে পারিনি। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের আরও বেশি মানুষের সেবা করার তাওফিক দান করেন, আপনারা সে জন্য দোয়া করবেন। জামায়াতে ইসলামী সবসময় জনগণের পাশে ছিল, আছে এবং ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতেও থাকবে।”

তিনি আরও বলেন, “দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কষ্ট লাঘবে সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। মানবসেবার এই দায়িত্ব কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নয়; এটি সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। আল্লাহ আমাদের সবাইকে মানুষের কল্যাণে কাজ করার তাওফিক দান করুন।”

নগর জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য ও চান্দগাঁও থানা আমীর মুহাম্মদ ইসমাইলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শাহজাহান, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগরী আমীর মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আমীর আলাউদ্দিন সিকদার, চট্টগ্রাম মহানগরীর এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি মুহাম্মদ উল্লাহ ও ফয়সাল মুহাম্মদ ইউনুছ।

এর আগে ডা. শফিকুর রহমান চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে পৌঁছালে সেখানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য অধ্যাপক আহছানুল্লাহ, চট্টগ্রাম মহানগরীর নায়েবে আমীর আমিরুজ্জামানসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। পরে তিনি বন্যাকবলিত এলাকার সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজখবর নেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে থাকার জন্য সংগঠনের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান।

বাঁশখালী ও সাতকানিয়ার বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে

চট্টগ্রামের বাঁশখালী ও সাতকানিয়ায় টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের খোঁজখবর নিতে এবং তাদের পাশে দাঁড়াতে বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এমপি।

গতকাল শুক্রবার সকালে চট্টগ্রামে পৌঁছে তিনি বাঁশখালী ও সাতকানিয়ার বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি দুর্গত মানুষের সঙ্গে কথা বলেন, তাদের দুর্ভোগের কথা শোনেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে শুকনো খাবার ও আর্থিক সহায়তা বিতরণ করেন।

পরিদর্শন শেষে ডা. শফিকুর রহমান এমপি বলেন, “প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি মানুষ যেন তাদের ন্যায্য অধিকার ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পায়, সে বিষয়ে সরকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।”

তিনি বলেন, “সাম্প্রতিক বন্যায় বহু মানুষ ঘরবাড়ি, ফসল ও সহায়-সম্পদ হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। উদ্ধার কার্যক্রম আরও জোরদার করার পাশাপাশি পর্যাপ্ত ত্রাণ, চিকিৎসাসেবা এবং দ্রুত পুনর্বাসনের জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।”

তিনি আরও বলেন, “মানুষের দুর্দিনে রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো জনগণের পাশে দাঁড়ানো। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী অতীতের মতো এবারও বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে থাকবে, ইনশাআল্লাহ।”

এর আগে সকাল ৯টায় চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে দলীয় নেতাকর্মীরা তাঁকে ফুলেল শুভেচ্ছায় বরণ করেন। বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, “আমাদের সীমিত সামর্থ্য অনুযায়ী আমরা এই বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াব। বিশেষ করে নিহতদের পরিবারের কাছে আমরা পৌঁছাব। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দলের সংশ্লিষ্ট সকল সংগঠনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্র থেকে আমরা পুরো কার্যক্রম সমন্বয় করছি।”

পরিদর্শনকালে তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শাহাজাহান, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী এমপি, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগর আমীর মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য ও চট্টগ্রাম অঞ্চল টিম সদস্য মুহাম্মদ জাফর সাদেক, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আমীর মুহাম্মদ আনোয়ারুল আলম চৌধুরী, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আমীর আলাউদ্দিন সিকদার,

চট্টগ্রাম মহানগরী সেক্রেটারি মুহাম্মদ নুরুল আমিন, চট্টগ্রাম-১৬ আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা জহিরুল ইসলাম এমপি এবং ডাকসুর সাবেক জিএস ও ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ, চট্টগ্রাম মহানগরীর এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ফয়সাল মুহাম্মদ ইউনুস, সাংগঠনিক সম্পাদক ও মেয়র প্রার্থী অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান হেলালী, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন চট্টগ্রাম মহানগরীর সভাপতি এস এম লুৎফর রহমান, নগর কর্মপরিষদ সদস্য ড. আ ম ম মসরুর হোসাইনসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।

তিস্তা মহাপরিকল্পনার দৃশ্যমান বাস্তবায়ন দেখতে চায় জনগণ

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকার যে অঙ্গীকার করেছে, জনগণ এখন তার দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে চায়। প্রকল্পটি বড় হওয়ায় বাস্তবায়নে সময় লাগতে পারে, তবে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ শুরু হয়েছে-এমন দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখতে চায় দেশের মানুষ।

গতকাল শুক্রবার বন্যা পরিস্থিতি পরিদর্শন ও বন্যাদুর্গত মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রামে এসে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, দেশের চারটি বিভাগ-চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ-বর্তমানে বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের দিক থেকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে রংপুর বিভাগ ভবিষ্যতে আরও বড় হুমকির মুখে পড়তে পারে। তিস্তার উজানে বাঁধের গেট খুলে দেওয়া হলে প্রতি বছরের মতো ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।

জামায়াত আমীর বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে তাদের দল দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার রয়েছে। সরকারও এ বিষয়ে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। এখন সেই অঙ্গীকার বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করুক-এটাই জনগণের প্রত্যাশা।

তিনি বলেন, “আমরা জানি, এটি একটি বৃহৎ প্রকল্প। বাস্তবায়নে সময় লাগবে। কিন্তু আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ শুরু হোক এবং জনগণ যেন তার দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে পারে।”

চট্টগ্রামের চলমান বন্যা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বন্যাদুর্গত মানুষের দুর্দশা সরেজমিনে পরিদর্শন, তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়নের মাধ্যমে সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় দাবি তুলে ধরাই তাদের সফরের মূল উদ্দেশ্য।

তিনি সাম্প্রতিক বন্যা ও পাহাড়ধসে নিহতদের প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।

চট্টগ্রাম মহানগরের জলাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামে সামান্য বর্ষণ হলেই ব্যাপক দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়। নালা-নর্দমা উপচেপড়ে, জলাবদ্ধতায় জনজীবন স্থবির হয়ে যায় এবং প্রতিবছর প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। এসব সমস্যা সমাধান করা সরকারের দায়িত্ব হলেও বিরোধী রাজনৈতিক দল হিসেবে জনগণের সমস্যাগুলো সরকারের সামনে তুলে ধরা এবং সমাধানের দাবি জানানোও তাদের দায়িত্ব বলে তিনি উল্লেখ করেন।