দেশ তো নাগরিকদের। দেশ নিয়ে নাগরিকরা স্বপ্ন দেখবেন, কথা বলবেনÑ এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নাগরিকদের স্বপ্ন কতটা পূর্ণ হয়? স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর এই প্রশ্নটি বড় হয়ে উঠেছে। স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে উচ্চকণ্ঠে আওয়াজ তুলেছিল দেশের ছাত্রজনতা, চব্বিশের জুলাইয়ে। জুলাই পণিত হয়েছিল ৩৬ লড়াইয়ে। আবারও প্রশ্ন, জুলাইয়ের স্বপ্ন কি পূরণ হবে? এই প্রশ্নের সাথে ছাব্বিশের জুলাইয়ে যুক্ত হয়েছে একটি ধাক্কা। দেশের ৩৬ শতাংশ ছাত্রছাত্রী এবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিচ্ছে না। বিষয়টি শুধু বিস্ময়ের নয়, ভয় পাওয়ার মতোও বটে। অথচ এ বিষয়টি নিয়ে তেমন আলোচনা হচ্ছে না। তবে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান। একটি জাতীয় দৈনিকে অভিমত প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, এ মুহূর্তে আমাদের লক্ষ্যমাত্রা এবং আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকটা ‘ফিল গুড’ ধরনের আবহ চলছে। এক ধরনের আত্মতুষ্টিতে চারদিক সয়লাব হয়ে আছে। কিন্তু উচ্চমাধ্যমিকের মতো একটি পরীক্ষায় ৩৬ শতাংশ ছাত্রছাত্রী পরীক্ষা দেবে নাÑ এর চেয়ে বড় ধরনের মানসিক ধাক্কা আর হয় না। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর পরীক্ষায় অংশ না নেয়ার এই যে তথ্যÑ এর মানে টা কী? আমার মনে হয়, এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক উত্তর দেয়া উচিত নয়। তবে একটি কথা তাৎক্ষণিকভাবেই বলা যায় যে, আমাদের সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থা যে বেহাল, তার একটি প্রতিফলন এটি। আর এই শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি রূঢ়ভাবে আমাদের জাগিয়ে তোলার একটা ধাক্কা দিচ্ছে। এর অর্থ খুঁজতে হবে। তিনি প্রশ্ন করেন, কেন তারা পরীক্ষা দিচ্ছে না? ছাত্রছাত্রী, মা-বাবা বা অভিভাবকরা কি পুরোপুরি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর থেকে মুখ সরিয়ে নিচ্ছেন? নাকি তাদের কোনো ভিন্ন ধরনের অসুবিধা আছে? তাৎক্ষণিকভাবে উত্তরগুলো দেওয়ারও একটা সমস্যা দাঁড়িয়ে গেছে। আমার মনে হয় এখানে গভীর অনুসন্ধানের বিষয়টি অনুপস্থিত হয়ে আছে। আমাদের গবেষক বলি, নীতিনির্ধারক বলি বা যারা কমেন্ট করছেন, আমরা কেউই বাস্তব পরিস্থিতি উপলব্ধি করতে পারছি না।

হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, যে মাসে এই পরীক্ষা হচ্ছে, সেই জুলাই মাসে দুই বছর আগে বিরাট গণআন্দোলন হয়েছিল। সেই জুলাইয়ের আন্দোলনে ছাত্রছাত্রীরাই তো সবচেয়ে বড় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিল। একদম শেষ মুহূর্তে সেই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের জন্য তাদের আকাক্সক্ষা ছিল; কিন্তু আমার মনে হয়, জুলাই পরিবর্তনের পরে আমাদের অন্তর্বর্তী সরকার, সার্বিকভাবে আমরা সামাজিক এলিট বলি, নতুন সরকার বলিÑ তারা কেউই ছাত্রছাত্রী তথা যুব সমাজের কথা শোনেনি। সত্য কথা বলতে আমরা তাদের বোঝারও চেষ্টা করিনি। তাদের বেদনা, তাদের আকাক্সক্ষা,তাদের যেটা বলা যায় যে কনফিউশন, বিভ্রান্তিÑ সবগুলো নিয়ে আমরা গভীরভাবে বোঝার চেষ্টাটা করিনি। সেটা অন্তর্বর্তী সরকার, বর্তমান সরকার বা আমরা যারা এসব নিয়ে কথা বলি, তাদেরও বিশ্বাসযোগ্যভাবে অনুসন্ধানের চেষ্টা নেই। শোনার জায়গাটিকে বাদ দিয়ে নানা ধরনের সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে; কিন্তু যাদের নিয়ে সমাধান, তাদের বিষয়টি আমরা শুনছি না। ৩৬ শতাংশ ছাত্রছাত্রী পরীক্ষা দিচ্ছেন না, তাহলে কি শিক্ষাব্যবস্থার ওপর এক ধরনের নো-কনফিডেন্সের’ বিষয় একটা দাঁড়িয়ে আছে? এরা কোথায় যাবে? বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে এসব ভাবা। এ মুহূর্তে রাষ্ট্রীয় এ সাজের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে তিনটা বিষয় আছে। অর্থনীতি, ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ক ও শিক্ষা। এই শিক্ষা হচ্ছে নতুন প্রজন্মের উন্নতির বাহন। কিন্তু সেই শিক্ষা নিয়ে এই মুহূর্তে আমরা সেই মনোযোগটা দিচ্ছি না এবং দেওয়ার লক্ষণটাও জোরালোভাবে অনুভব করছি না। এখানে আমরা সার্বিকভাবে অন্য যেসব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিÑ ট্রিলিয়ন ডলার আয়

চড়ংঃ-১ (ই) ০৮-০৭-২৬

বা এ ধরনের নানা পরিকল্পনা, সেগুলো কিন্তু কাগজের বিষয় হয়ে যাবে। যদি না এই প্রজন্মকে, এই মানুষগুলোকে আমরা চিন্তার বা মনোযোগ দিয়ে শোনার সংস্কৃতির বাইরে রাখি। এরা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় রাষ্ট্র থেকে, শিক্ষা থেকে-তাহলে আমাদের কোনো ভবিষ্যৎ থাকবে না। রাষ্ট্র নির্মাণে তাদের আবেগঘন সম্পৃক্ততা যদি আলগা হয়ে যায়, তাহলে সমাজে অস্থিরতার বিষয়টা অনেক বেড়ে যাবে। এর কিছু নিদর্শন আমরা ইতিমধ্যে দেখতে পাচ্ছি। অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির আলোচনা চলুক। কিন্তু শিক্ষা নিয়ে চর্বিত চর্বন নয়। নিজেরা যা মনে করি, তা সমাধন নয়। এখন দরকার হলো শোনার ব্যাপারটা। শিক্ষকদের শুনতে হবে, ছাত্র-ছাত্রীদের শুনতে হবে এবং তাদের বাবা-মায়েদেরও শুনতে হবে। সবশেষে তিনি সততার সঙ্গে আত্মমূল্যায়নের কথা বলেছেন এবং বলেছেন এর কোনো বিকল্প নেই।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান শোনার কথা বললেন, আত্মসমালোচনা ও আত্মমূল্যায়নের কথা বললেন এবং বিশেষভাবে বললেন নতুন প্রকন্মের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার কথা। আরো বললেন, এই প্রজন্ম যদি রাষ্ট্র থেকে, শিক্ষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়-তাহলে আমাদের কোনো ভবিষ্যৎ থাকবে না।

বিদ্বান ও অনুসন্ধানী নাগরিক হোসেন জিল্লুর রহমান যখন দেশের সংকট নিয়ে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে কথা বলছেন, তখন আমাদের নেতারা জুলাই-মঞ্চে কী করছেন? তাদের কেউ কেউ তো কাব্য করছেন, নাটক করছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির এক অনুষ্ঠানে পহেলা জুলাইয়ের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শাসকদলের এক কেন্দ্রীয় নেতা বললেন, ‘অভূতপূর্ব এ আন্দোলন, উদ্দীপ্ত এ আন্দোলন! আমি চীনের প্রাচীর দেখিনি আমি আবু সাঈদের বুক দেখেছি। চীনের প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে থেকে কী করে গুলী খায়, সেই দৃশ্য আমি দেখেছি।’ জুলাই শহীদ ও জুলাই আন্দোলনের প্রতি আপনাদের যখন এত আবেগ ও ভালোবাসা, তখন পার্লামেন্টে এবং সরকারী সিদ্ধান্তে তার যৌক্তিক প্রকাশ ঘটছে না কেন? বরং লক্ষ্য করা যাচ্ছে জুলাই আন্দোলন, জুলাই সনদ ও সংস্কার-অঙ্গীকারের প্রতি এক ধরনের অনীহা। জুলাই যোদ্ধাদের হেয় করার প্রবণতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর দায় সরকার ও সরকারী দল এড়াতে পারে না। যারা সরকারের বাইরে আছেন, তারাও কি ছাত্র-জনতার বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্খার বিষয়গুলো সম্যকভাবে উপলব্ধি করতে পারছেন? এমন প্রশ্ন সৃষ্টি হয় তখন, যখন দেখা যায় তথ্য-উপাত্ত ও বাস্তব সত্যকে এড়িয়ে গিয়ে কেউ কাউকে ছোটো করার চেষ্টা করছেন। একশ্রেণীর গণমাধ্যম কর্মীকেও এক্ষেত্রে সহচরের ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। ফ্যাসিস্ট পতনের দৃশ্য এত দ্রুত আমরা ভুলে গেলাম কেমন করে? আসলে চাতুর্য করে, গোয়েবলসের শিষ্য বনে জনতার বন্ধু হওয়া যায় না, পরিবর্তন তো অনেক দূরের কথা।

জুলাই নিয়ে যখন ড্রামা হয়, তখন রাজনীতির প্রতি সৃষ্টি হয় এক ধরনের ঘৃণা। এমন বাস্তবতায় কথামালার রাজনীতির বদলে আমাদের ফিরে যেতে হবে জুলাই আন্দোলনের রাজপথে ইতিহাসের নির্মোহ ভাষ্যে। জুলাই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ এবং নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত। আন্দোলনে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটেছে, কিন্তু ওই ব্যবস্থার বিলোপ ঘটেনি। পুরোনো ব্যবস্থা এখনো রয়ে গেছে। এই ব্যবস্থার রাজনৈতিক নেতৃত্ব সরে গেলেও, ভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্ব সে ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে। তাই জুলাইয়ের লড়াইটা এখনো খুবই প্রাসঙ্গিক। পুরানো ব্যবস্থা ভাঙতে হবে, পরিবর্তন আনতেই হবে। যারা এই পরিবর্তনের বিপক্ষে, তারাই জুলাই সনদের সাথে অব্যাহত রেখেছেন প্রতারণাপূর্ণ আচরণ। নির্বাচনের পর, নতুন সরকার গঠনের পর রাজনৈতিক বোলচালে বেশ পার্থক্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেকের বক্তব্যে মনে হয়, জুলাই অভ্যুত্থান যেন সরকার পতনের একটি ঘটনা। তাদের দৃষ্টিতে আওয়ামী লগের পতনটাই অর্জন এবং এখানেই জুলাই শেষ। অথচ জুলাই যোদ্ধারা মনে করেন, এখান থেকেই শুরু। কারণ, সরকার পবিরর্তন অনিবার্য হয়ে উঠলেও সেটা মূল লক্ষ্য ছিল না। মূল লক্ষ্য ছিল ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ এবং নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত। এর জন্য প্রয়োজন জুলাই সনদের বাস্তবায়ন, প্রয়োজন সংস্কারের অঙ্গীকারে অটল থাকা। যারা এগুলো ধারণ করেন না, তারা কি করে বুঝবেন, কেন ৩৬ শতাংশ ছাত্রছাত্রী পরীক্ষায় অংশ নিলো না।