২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর ও নিষ্ঠুর এক লড়াইয়ের সাক্ষী হলো বিশ্ববাসী। সিয়াটলের লুমেন ফিল্ড স্টেডিয়ামে ম্যাচের ৮৬ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে এগিয়ে থেকেও শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় বেলজিয়ামের কাছে ৩-২ ব্যবধানে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল আফ্রিকান পরাশক্তি সেনেগাল। অতিরিক্ত সময়ের একদম শেষ মুহূর্তে (১২৫ মিনিটে) ভিএআর প্রযুক্তির সহায়তায় পাওয়া এক বিতর্কিত পেনাল্টি থেকে গোল করে বেলজিয়ামকে শেষ ষোলোর টিকিট এনে দেন অধিনায়ক ইউরি টিলেমান্স। ম্যাচের শুরু থেকেই সিয়াটলের মাঠে রাজত্ব করছিল সেনেগাল। ম্যাচের ২৪ মিনিটে সাদিও মানির ক্রস থেকে ইসমাইলা সারের নেওয়া হেড পোস্টে লেগে ফিরে এলে, রিবাউন্ড থেকে বল জালে জড়ান হাবিব দিয়ারা। প্রথমার্ধে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় সেনেগাল।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই (৫১ মিনিটে) মুসা নিয়াকাতের দূরপাল্লার পাস বুক দিয়ে দারুণভাবে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বেলজিয়ান রক্ষণভাগকে স্তব্ধ করে দেন ইসমাইলা সার। চমৎকার ফিনিশিংয়ে ব্যবধান ২-০ করেন তিনি। ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর বেলজিয়ামের বিদায় যখন সময়ের ব্যাপার মনে হচ্ছিল, তখনই মাস্টারস্ট্রোক খেলেন বেলজিয়ান কোচ। কেভিন ডি ব্রুইনা ও জেরেমি ডকুকে তুলে নিয়ে তিনি মাঠে নামান রোমেলু লুকাকু ও ডোডি লুকেবাকিওকে। ম্যাচের ৮৬ মিনিটে থমাস মুনিয়েরের অ্যাসিস্ট থেকে গোল করে বেলজিয়ামকে খেলায় ফেরান রোমেলু লুকাকু। এই গোলের ঠিক ৩ মিনিট পর (৮৯ মিনিটে) লিয়েন্দ্রো ট্রোসার্ডের ক্রসে দুর্দান্ত এক হেডে সেনেগালকে স্তব্ধ করে ম্যাচ ২-২ সমতায় আনেন ইউরি টিলেমান্স। নির্ধারিত ৯০ মিনিট ২-২ সমতায় শেষ হওয়ার পর খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। টাইব্রেকারের ঠিক আগ মুহূর্তে ১২০ মিনিটে টিমোথি কাস্তানিয়ের একটি নিচু ক্রস ডি-বক্সে ক্লিয়ার করতে গিয়ে বেলজিয়ামের টিলেমান্সকে ফাউল করে বসেন সেনেগালের লামিনে কামারা। রেফারি প্রথমে খেলা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেও দীর্ঘ ৭ মিনিট ভিএআর রিভিউ দেখার পর পেনাল্টির বিতর্কিত সিদ্ধান্ত দেন। ম্যাচের ১২৫তম মিনিটে অত্যন্ত ঠা-া মাথায় পেনাল্টি থেকে নিজের দ্বিতীয় গোল করে বেলজিয়ামের ৩-২ ব্যবধানের অবিশ্বাস্য জয় নিশ্চিত করেন অধিনায়ক টিলেমান্স।

ম্যাচ শেষে অবিশ্বাস্য জয়ে উচ্ছ্বসিত বেলজিয়ামের কোচ রূডি গার্সিয়া বলেছেন, "২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর আমাদের পরিকল্পনা বদলাতে হয়েছিল। ডি ব্রুইনা ও ডকুকে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, কিন্তু ছেলেদের ওপর আমার বিশ্বাস ছিল। লুকাকু মাঠে এসে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। আমাদের দলের এই লড়াকু মানসিকতাই আমাদের শেষ ষোলোতে নিয়ে গেছে।" ম্যাচের নায়ক ও বেলজিয়াম অধিনায়ক ইউরি টিলেমান্স বলেছেন, "১২৫ মিনিটে পেনাল্টি নেওয়ার সময় পুরো স্টেডিয়ামের চাপ আমার কাঁধে ছিল। আমি শুধু নিজের ওপর বিশ্বাস রেখেছিলাম। সেনেগাল অসাধারণ খেলেছে, কিন্তু আমরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হার মানিনি। এই জয় আমাদের বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা কামব্যাক হিসেবে ইতিহাস হয়ে থাকবে।"

অন্যদিকে, হৃদয়বিদারক এই হারের পর সেনেগালের কোচ পাপে থিয়াউ নিজের ক্ষোভ ও হতাশা লুকাতে পারেননি। তিনি বলেন, "ফুটবল সত্যিই নিষ্ঠুর। ৮৫ মিনিট পর্যন্ত ম্যাচটি আমাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ছেলেদের পারফরম্যান্সে আমি গর্বিত, কিন্তু অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তের ওই পেনাল্টির সিদ্ধান্তটি আমাদের সাথে চরম অন্যায়। ভিএআরের এমন বিতর্কিত সিদ্ধান্ত একটি দলের চার বছরের স্বপ্নকে মুহূর্তের মধ্যে ভেঙ্গে চুরমার করে দিল।" সেনেগালের অধিনায়ক ও তারকা ফরোয়ার্ড সাদিও মানে অশ্রুসিক্ত চোখে বলেছেন, "আমরা মাঠে আমাদের সবটুকু ঢেলে দিয়েছিলাম। ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকার পর এভাবে বিদায় নেওয়া মেনে নেওয়া যায় না। আমাদের রক্ষণভাগের শেষ মুহূর্তের কিছু মনোযোগের অভাব এবং রেফারির ওই একটি সিদ্ধান্ত আমাদের কাঁদিয়েছে। তবে আমরা মাথা উঁচু করেই বিদায় নিচ্ছি।"