ফুটবল বিশ্বে নতুন সূর্যোদয়। দীর্ঘ ১৬ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন এখন স্পেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত রোমাঞ্চকর ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বসেরা হওয়ার পাশাপাশি ফুটবল ইতিহাসে এক নতুন মহাকাব্য রচনা করেছে লুইস ডে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা। এই জয় কেবল একটি শিরোপা নয়, বরং সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা ৩৮ আন্তর্জাতিক ম্যাচে অপরাজিত থাকার অনন্য এক বিশ্বরেকর্ড গড়ে 'লা রোজারা' প্রমাণ করল, বর্তমান ফুটবলের অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি তারাই।

২০২৬ বিশ্বকাপ ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও বৈচিত্র্যময় আসর। ৪৮টি দলের অংশগ্রহণে ১০৪টি ম্যাচের এই টুর্নামেন্টের ফাইনালে স্পেনের দাপুটে পারফরম্যান্স ছিল দেখার মতো। ম্যাচের ১০৬ মিনিটে বদলি খেলোয়াড় ফেরান তোরেসের করা একমাত্র গোলটিই স্পেনের শিরোপা নিশ্চিত করে। পুরো ম্যাচজুড়ে স্পেনের ধৈর্যশীল ফুটবল এবং রক্ষণভাগ ছিল অভেদ্য। বিপরীতে, এনজো ফের্নান্দেজের লাল কার্ড ও একের পর এক অহেতুক ফাউলের কারণে আর্জেন্টিনা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হারায়। বিশ্বকাপের শিরোপা জয়ের পর স্পেনের রেটিং পয়েন্ট দাঁড়িয়েছে ১৯৯৫.৮৮, যার ফলে ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়েও তারা শীর্ষস্থান পুনরুদ্ধার করেছে।

এটি ছিল মহাতারকা লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ। ৩৯ বছর বয়সে এসে শিরোপার খুব কাছে গিয়েও তা হাতছাড়া হওয়ায় ম্যাচ শেষে মাঠেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তিনি। তবে মেসির অশ্রু ও হারের মধ্যেও এই বিশ্বকাপ উপহার দিয়েছে নতুন প্রজন্মের একঝাঁক প্রতিভা। এবারের আসরে ব্যক্তিগত পুরস্কারের ক্ষেত্রেও স্পেনের আধিপত্য ছিল লক্ষণীয়। আসরের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বল জিতেছেন রদ্রি, আর গোল্ডেন বুট উঠেছে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পের হাতে। সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার উঠেছে বার্সেলোনার বিস্ময়বালক পাউ কুবার্সির হাতে। এছাড়া সেরা গোলরক্ষকের গোল্ডেন গ্লাভ জিতেছেন স্পেনের উনাই সিমন।

ফাইনালের মঞ্চটি ছিল একদিকে যেমন উদযাপনের, তেমনি অন্যদিকে কিছু অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার সাক্ষী। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে স্প্যানিশ খেলোয়াড়দের সম্মান না জানিয়ে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের পিঠ ফিরিয়ে দাঁড়ানো এবং ম্যাচ শেষে হাতাহাতিতে জড়ানো ফুটবলপ্রেমীদের হতাশ করেছে। তবে মাঠের সেই বিতর্ক ছাপিয়ে শিরোপা জয়ের উচ্ছ্বাস নিয়ে সোমবার সকালে ট্রফি হাতে মাদ্রিদে পা রাখেন রদ্রি, লামিনে ইয়ামালরা। বিমানবন্দর থেকেই শুরু হওয়া এই উৎসব পুরো রাজধানীজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ‘স্পেন ২৬’ লেখা বিশেষ ট্র্যাকস্যুট পরিহিত চ্যাম্পিয়ন দলটি রাজপ্রাসাদে রাজা ষষ্ঠ ফেলিপের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের আমন্ত্রণে মনক্লোয়া প্রাসাদে সংবর্ধনা গ্রহণ করছে। দিনের শেষ পর্বে মাদ্রিদের ঐতিহাসিক সিবেলেস স্কয়ারে সমর্থকদের সঙ্গে বিজয় উৎসবে মেতে উঠবেন বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। অধিনায়ক রদ্রি, কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে এবং ফেডারেশন সভাপতি রাফায়েল লুসান ট্রফি উঁচিয়ে ধরে যখন জনসমুদ্রের সামনে আসেন, তখন যেন পুরো স্পেনবাসী বিশ্বজয়ের আনন্দে একাত্ম হয়ে ওঠে।

২০২৬ বিশ্বকাপের পর্দা নামার পরই এখন ফুটবলপ্রেমীদের নজর গিয়ে ঠেকেছে ২০৩০ বিশ্বকাপের দিকে। ফুটবল বিশ্বকাপের ১০০ বছর পূর্তিকে সামনে রেখে আয়োজিত হতে যাওয়া সেই আসরটি হবে ইতিহাসের সবচেয়ে অনন্য। প্রথমবারের মতো তিনটি মহাদেশÑইউরোপ, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার ছয়টি দেশে অনুষ্ঠিত হবে এই টুর্নামেন্ট। স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কো প্রধান আয়োজক হিসেবে মূল ম্যাচগুলোর দায়িত্ব পালন করবে। তবে প্রথম বিশ্বকাপের শতবর্ষ উদযাপনে আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে ও উরুগুয়েতে তিনটি বিশেষ ম্যাচ আয়োজিত হবে। একই সঙ্গে পুরুষ ও নারী উভয় বিভাগে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া স্পেন ২০৩০ সালের সেই মহাযজ্ঞের অন্যতম ফেভারিট হিসেবে মাঠে নামবে। যে দুর্দান্ত যাত্রা ২০২৬ সালে শুরু হলো, তা ২০৩০ সালে শতবর্ষের মহোৎসবে পূর্ণতা পাবেÑএমনটাই প্রত্যাশা ফুটবল বিশ্বের।