জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে ছাত্র-শ্রমিক-জনতার আত্মত্যাগ, জুলাই সনদ ও শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং বিটিসিএলের ১২শ গ্রেডের কর্মচারীদের চাকরি বিধিমালা-২০১১ অনুযায়ী আনুতোষিক সহ সকল ন্যায্য অধিকার আদায়ের দাবিতে আলোচনাসভা করেছে বাংলাদেশ টি অ্যান্ড টি শ্রমিক কর্মচারী আদর্শ ফেডারেল ইউনিয়ন।

রোববার (২৬ জুলাই) দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে রাজধানীর রমনা টেলিফোন ভবনে অবস্থিত ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়।

বাংলাদেশ টি অ্যান্ড টি শ্রমিক কর্মচারী আদর্শ ফেডারেল ইউনিয়নের সভাপতি নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান।

প্রধান অতিথি তার বক্তব্যে বলেন, জুলাইয়ের আত্মত্যাগের মর্যাদায় সরকারের ভালো কাজে সহযোগিতা করবো; কিন্তু রক্তাক্ত ছাত্রজনতার পুনরাবৃত্তি আর দেখতে চাই না। জুলাইয়ে রক্তে ভিজাএ দেশে স্বৈরাচারের পুনরাবৃত্তি হতে দেব না।

অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ছাত্র-জনতা ও শ্রমিকদের স্মরণ এ কর্মসূচির মাধ্যমে মহান আল্লাহর দরবারে তাদের রুহের মাগফিরাত ও শহীদি মর্যাদা কামনা করেন।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ২৬ জুলাই দেশের ইতিহাসে এক ভয়াবহ দিন হিসেবে স্মরণীয়। রংপুরে আবু সাঈদসহ অসংখ্য ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ এবং সে সময়ের দমন-পীড়নের বর্ণনা দিয়ে বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ জাতির ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ছাত্রসমাজের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে কর্মক্ষম সাধারণ শ্রমজীবী মানুষও রাজপথে নেমেছিলেন। রাজমিস্ত্রী, গার্মেন্টস, রিকশাচালক ও নারী শ্রমিকসহ তিন শতাধিক শ্রমিক শহীদ হয়েছেন। তাদের আত্মত্যাগের ফলেই দেশ একটি নতুন বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে।

অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, ১৯৫২ থেকে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি আন্দোলনেই ছাত্র, শ্রমিক ও জনতার আত্মত্যাগ রয়েছে।

তিনি বলেন, দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে শ্রমজীবী মানুষও ভালো থাকবে। রাজনৈতিক অস্থিরতা কখনোই দেশের মানুষের কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না।

তিনি অভিযোগ করেন, বিগত সরকারের সময় বিরোধী রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন মতাদর্শের নেতাকর্মীদের হত্যা, গুম, কারাবরণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কোনো ছাত্র-জনতা বা শ্রমিকের রক্ত যেন আর না ঝরে এবং হরতাল-অবরোধসহ এমন কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, যা দেশের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেয়।

জুলাইয়ের চেতনার আলোকে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। জুলাই সনদ, প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও গণভোটের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, গত ১৫ বছরে এ ধরনের কর্মসূচি পালন করার পরিবেশ ছিল না।

শ্রমিক অধিকার প্রসঙ্গে অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন আইন, শ্রম আইন, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-এর কনভেনশন এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের আলোকে ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করে। কিন্তু অতীতে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সুযোগ সংকুচিত করা হয়েছিল।

তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে গণতান্ত্রিক চর্চা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ট্রেড ইউনিয়নে গণতন্ত্র না থাকলে তা একসময় স্বৈরতান্ত্রিক রূপ নেয়। তিনি বিনা কারণে বদলি, বদলি-বাণিজ্য ও প্রশাসনিক হয়রানি বন্ধের দাবি জানান। একই সঙ্গে বিটিসিএলের চাকরি বিধিমালা-২০১১ অনুযায়ী বিদ্যমান বৈষম্য দূর করা, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি বাস্তবায়ন এবং স্বৈরাচারী আমলের ইউনিয়ন বাতিল করতে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কোনো নেতা বদলি-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত নন এবং ভবিষ্যতেও এমন অনিয়ম বরদাশত করা হবে না। শ্রমিকদের কল্যাণমূলক দাবিগুলো বাস্তবায়ন, একই প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের মধ্যে বৈষম্য দূর করা এবং শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষায় দায়িত্বশীলদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “শ্রমিককে বঞ্চিত করে রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন কখনো সম্ভব নয়। সরকারের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করেই শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় আমরা কাজ করে যেতে চাই।”

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারন সম্পাদক লসকর মো তসলিম, সহ-সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আলমগীর হোসাইন, কেন্দ্রীয় ট্রেডইউনিয়ন সম্পাদক সোহেল রানা মিঠু।

সাধারন সম্পাদক আমিনুল ইসলাম এর সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য রাখেন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক নেতা আয়ুব আলী,

রেলওয়ে এমপ্লয়ীজ লীগ এর সহসভাপতি ওমর ফারুক, টি অ্যান্ড টি শ্রমিক কর্মচারী আদর্শ ফেডারেল ইউনিয়ন সহ-সভাপতি ইউনুস চৌধুরী, এমদাদুল হক, মহাসচিব রুহুল আমীন, কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক কামাল হোসেন প্রমুখ।